বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৬:৪৭ পূর্বাহ্ন
ভোটের আড়ালে তথ্য-সন্ত্রাস: জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে একাত্তরের অপশক্তির ভয়ংকর খেলা Reading Time: 3 minutes
শামীম আহমেদ:
ভোটকে সামনে রেখে একাত্তরে মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত, বাংলাদেশ বিরোধী একটি রাজনৈতিক দল বিশেষ করে তাদের মহিলা কর্মীদের বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ও ভয়ংকর এক খেলায় নামিয়ে দিয়েছে। ভোটের সময় বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের দলের পক্ষে, প্রতীকের পক্ষে, প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইবে—এটি খুবই স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক বিষয়। কিন্তু দেশবিরোধী ওই রাজনৈতিক দলের কর্মীরা এক বিশেষ, সুদূরপ্রসারী ও ধ্বংসাত্মক উদ্দেশ্যে নির্বাচনের এই সময়কে পুঁজি করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রত্যেকটা ভোটারের অত্যন্ত সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করছে, যার মধ্যে রয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং বিকাশ নম্বর-এর মতো স্পর্শকাতর উপাত্ত। বিশ্বের যেকোনো সভ্য দেশে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে সংগ্রহ করা রীতিমতো আইন বিরুদ্ধ, শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন নয়, বরং এটি একটি পরিকল্পিত ‘তথ্য-সন্ত্রাস’ যা দেশের সাইবার নিরাপত্তা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত । এই সংবেদনশীল তথ্যগুলোকে ব্যবহার করে নানা রকম গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করা সম্ভব, যা একজন সাধারণ নাগরিকের জীবনকে মুহূর্তেই দুর্বিষহ করে তুলতে পারে; যেমন ন্যাশনাল আইডি কার্ড (NID) ব্যবহার করে যেকোনো ব্যক্তির পরিচয় চুরি করে বা ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে সেই দায় এনআইডির মালিকের উপর চাপানো সম্ভব,
অপরাধীরা ভুয়া পরিচয় তৈরি করে লোন নিতে পারে ।
অবৈধভাবে সিম কার্ড উত্তোলন করা সম্ভব, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের জালিয়াতি করা সম্ভব, জমি বা সম্পত্তি দখল ও বিক্রি করা সম্ভব এবং পাসপোর্ট জালিয়াতি করা সম্ভব।
২০০৬ সালে আমেরিকায় একজন চোর এক মহিলার ড্রাইভিং লাইসেন্স চুরি করে তার নামে হাসপাতালে সন্তান প্রসব করে, যার ফলে ভিকটিমকে ১০,০০০ ডলারের বিল গুনতে হয়েছে। বাংলাদেশে অনুরূপ ঘটনা ঘটলে, NID-এর মালিককে অজান্তেই অপরাধের দায়ভার বহন করতে হবে।
NID ব্যবহার করে অপরাধীরা ভুয়া সিম কার্ড কিনতে পারে, যা পরবর্তীতে চাঁদাবাজি বা সাইবার অপরাধে ব্যবহার হয়। বাংলাদেশে ২০১৭ সাল থেকে বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন চালু হলেও, ফেক NID দিয়ে সিম কার্ড কেনা সম্ভব হয়েছে, যা RAB-এর অভিযানে প্রমাণিত।
অন্যদিকে, সিম কার্ডের তথ্য ব্যবহার করে বা সিম কার্ড ব্যবহার করে আর্থিক প্রতারণা ও বিভিন্ন স্ক্যাম করা সম্ভব, বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও হুমকি-ধমকিতে এই সিম কার্ড ব্যবহার করা সম্ভব, সাইবার অপরাধ ও গুজব ছড়িয়ে সমাজে অস্থিরতা তৈরি করা সম্ভব এবং গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই সিম কার্ড ব্যবহার সম্ভব।
NID দিয়ে ভুয়া দলিল তৈরি করে জমি দখল করা যায়। যেমন ২০২৩ সালে প্রথম আলোর রিপোর্টে দেখা গেছে যে লিক হওয়া NID দিয়ে অপরাধীরা সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করেছে।
সিম নম্বর ব্যবহার করে ফিশিং বা স্ক্যাম কল করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৬ সালে একটি টেলিগ্রাম-ভিত্তিক ফ্রড রিং ধরা পড়েছে, যারা হাজার হাজার সিম কার্ড ব্যবহার করে অর্থ চুরি করেছে।
বিকাশ নম্বর দিয়ে অবৈধ ট্রান্সফার সম্ভব, যা ভিকটিমের অ্যাকাউন্ট খালি করে।
অপরাধীরা সিম কার্ড ব্যবহার করে হুমকি দেয় বা চাঁদা দাবি করে। বাংলাদেশে ফেক সিম দিয়ে এমন অপরাধ সাধারণ, যেমন ২০২৩ সালে প্রথম আলোর রিপোর্টে দেখা গেছে যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট চুরি করে সিম কার্ড কেনা হয়েছে চাঁদাবাজির জন্য।
সবচেয়ে আতঙ্কজনক বিষয় হলো, এই তথ্য সংগ্রহের পেছনে আরও গভীর ও মারাত্মক ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া যাচ্ছে; শোনা যাচ্ছে, বিশেষ একটি মুসলিম দেশ যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল, সেই দেশটার কাছে এসব তথ্য সরবরাহ করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে ও নির্বাচনের সময় দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে দেশবিরোধী শক্তিটি প্রত্যেকটা এনআইডির বিপরীতে মোটা অংকের অর্থ ও বরাদ্দ বা অনুদান নিচ্ছে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী কৌশল নয়; এটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা। আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বা জঙ্গি কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত বিভিন্ন সংস্থা মোটা দামে মানুষের এরকম সংবেদনশীল তথ্য কেনাবেচা করে। নির্বাচনের সময় এই সুযোগকে ব্যবহার করে দেশবিরোধী এ সমস্ত রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ ও তাদের জনগণকে এরকম মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ফেলে দিচ্ছে, যা কল্পনাতীত। খেয়াল করে দেখবেন, বাংলাদেশ বিরোধী এই রাজনৈতিক দল বা তাদের মোর্চার দেশকে গঠনের বা দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো বাস্তবমুখী পরিকল্পনা তারা জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে পারেনি। তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব এতটাই প্রকট যে, নির্বাচনে তারা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা, কর্তৃপক্ষ ও নেতৃবৃন্দকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করাকেই তাদের একমাত্র রাজনৈতিক কৌশল এবং নির্বাচনী কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে। দেশের মানুষের জন্য দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের বাস্তবমুখী কোনো কর্ম পরিকল্পনা নেই। এরা সবসময়ই রাজনৈতিক পরিবেশ ঘোলাটে করে, নির্বাচনের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে চায়। নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করে দেশকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে চায়। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো—গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে অসাংবিধানিক পথে ক্ষমতা দখল করা। তাই, জনগণকে আজ সব ধরণের মিথ্যাচার ও প্রতারকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। যারা আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে দেশের সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করছে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করা প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। এই তথ্য-সন্ত্রাসকে রুখে দাঁড়ান এবং দেশবিরোধী এই অপশক্তির সকল ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিন।