মঙ্গলবার, ২১ Jul ২০২৬, ১১:৩৭ পূর্বাহ্ন
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফটো গ্রাফার সুমন দাস বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ফটো গ্রাফার খালেদ হোসেন পরাগের সাথে মোটা অংকের লেন-দেন করেন। খালেদ হোসেন পরাগ পাবনার জেলা প্রশাসক এবং গণপুর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবিরকে দিয়ে টেন্ডার কার্যক্রম স্থগিত করেন। Reading Time: 5 minutes
নিজস্ব সংবাদদাতা, পাবনা :
না আছে মন্দির, না আছে সনাতনী ধর্মাবলম্বিদের দেব দেবীর প্রতিকৃতি? কিছু ভগ্নপ্রায় স্থাপনাকে মাতৃমন্দির ও বিশ্ব বিজ্ঞান কেন্দ্র হিসাবে দাবি করেছেন ঠাকুর অনুকুল চন্দ্রের সৎসঙ্গ বাংলাদেশের সহ সাধারণ সম্পাদক সুব্রত আদিত্য ও কতিপয় নেতৃবৃন্দ। বিগত বিএনপি সরকার তাদের দাবির প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্তে তাদের দাবি মিথ্যা প্রমানিত হওয়ায় কমিটি তাদের দাবিকে মিথ্যা হিসাবে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্ল্যেখ করেন।
এদিকে সম্প্রতি ভগ্নপ্রায় ভবন দুটি অপসারন করে পাবনা মানসিক হাসপাতালকে বর্তমান বিএনপি সরকার বিশ্বমানের আধুনিক ইনস্টিটিউট নির্মানের জন্য অর্থ বরাদ্ধের মাধ্যমে গণপুর্ত বিভাগ টেন্ডার আহবান করেছিল।

সনাতনী ধর্মের কয়েকজন ব্যাক্তি ও আওয়ামীলীগের কয়েকজন দোষরদের অনুরোধে সরকারের উন্নয়ন কাজের দরপত্র স্থগিত করলেন জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম এবং গণপুর্ত বিভাগের পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবির।
প্রায় অর্ধ শতাব্দির পর বিএনপি’র সরকারের নির্দেশে পাবনা মানসিক হাসপাতালের উন্নয়ন কাজ শুরু করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে টেন্ডার আহবান করা হয়। অভিযোগ রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ফটোগ্রাফার খালেদ হোসেন পরাগের নির্দেশে এ কাজ বন্ধ করা হয়। খালেদ হোসেন পরাগ কেন এমন নির্দেশনা দিলেন। একটি সুত্র নিশ্চিত করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফটো গ্রাফার সুমন দাস বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ফটো গ্রাফার খালেদ হোসেন পরাগের সাথে মোটা অংকের লেন-দেন করেন। খালেদ হোসেন পরাগ পাবনার জেলা প্রশাসক এবং গণপুর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবিরকে দিয়ে টেন্ডার কার্যক্রম স্থগিত করেন। জেলা প্রশাসক কার্যালয়, পুলিশ সুপার কার্যালয়, গণপুর্ত কার্যালয় এবং পাবনা মানসিক হাসপাতালে পরিচালকের কার্যালয়ে গিয়ে এ টেন্ডার বন্ধের সকল প্রক্রিয়া দেখভাল করেন, পরাগের পাবনার ব্যাক্তিগত সহকারী হিসাবে পরিচিত এফ এম আবু জার ওরফে ফয়সাল। হিন্দুদের প্রতিনিধি হিসাবে তদারকি করেন, ফ্যাসিষ্ট আওয়ামীলীগ ও পাবনা জেলা হিন্দু মহাজোটের নেতা শ্রী আশিষ কুমার বশাক এবং পাবনা ৫ আসনের সাবেক আওয়ামীলীগ সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক খন্দকার প্রিন্সের বিয়াই মোঃ খোকন।

টেন্ডার কার্যক্রম বন্ধ করেই ষড়যন্ত্রকারীরা দমে যাননি। ঘটনাটি ফলাও করে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার ও প্রকাশ করা হয়। ইতিপুর্বে পাবনা মানসিক হাসপাতালের সাবেক পরচিালক তন্ময় প্রকাশ বিশ্বাসকে ম্যানেজ করে, ঠাকুরের আতুর ঘর দেখিয়ে হাইকোর্ট থেকে রিট করে, রায় তাদের পক্ষে নিয়ে এসেছিল। হাইকোটের রায়ের পরবর্তিতে ঠাকুরের শত শত ভক্ত চক্রান্ত করে হাসপাতালের সিমানা প্রাচীর ভেঙ্গে হাসপাতালের অভ্যান্তরের যায়গা দখল করেছিল। ষড়যন্ত্রেও অংশ হিসাবে এবারও টেন্ডারের কার্যক্রম স্থগিত দেখিয়ে তারা হাইকোর্টে রিট করে পুরো মানসিক হাসপাতালটির জমি গ্রাস করার হীন কর্মকান্ডে লিপ্ত রয়েছে। হিন্দু মহাজোটের নেতা আশিষ কুমার বশাক গাইবান্ধার রাম মন্দিরের মত পাবনা মানসিক হাসপাতাল চত্বরে ঠাকুর অনুকুল চন্দ্রের মুর্তি বানিয়ে হাসপাতালটিকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এতে সহযোগিতা করছেন, খালেদ হোসেন পরাগ, আওয়ামীলীগ নেতা আশিষ কুমার বশাক, এফএম আবু জার ওরফে ফয়সাল সহ আত্মগোপনে থাকা ষড়যন্ত্রকারীরা।

সম্প্রতি গত ২জুন ২০২৬ ইং তারিখে দৈনিক বাংলা নিউজের ওনলাইন ভার্সনে ” পাবনায় ঠাকুর অনুকুল চন্দ্রের স্মৃতি বিজরিত ২ ভবনের নিলাম স্থগিত” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: রাশেদ কবির ওই প্রতিবেদককে জানান, পাবনা মানসিক হাসপাতালে বিশ্বমানের আধুনিক ইনস্টিটিউট প্রকল্পের জন্য মোট ১৩টি পুরাতন ও পরিত্যক্ত ভবন অপসারণের জন্য বুধবার থেকে দরপত্র আহ্বান করার কথা ছিল। যার মধ্যে এই দুটি ভবনও অন্তর্ভুক্ত ছিল। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ভবন দুটি নিলাম কার্যক্রম স্থাগিত করা হয়।
উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশের বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করা হয়। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সংসঙ্গ বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠন দাবি করে আসছেন, টেন্ডারে নিলাম করা অপসারনের জন্য ভবনটি তাদের ঠাকুর অনুকুল চন্দ্র ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত করেন মাতৃমন্দির এবং বিশ^বিজ্ঞান কেন্দ্র। ১৯৪৬ সালে ঠাকুর ভারতে চলে যান। তরপর থেকে ভবনগুলি পরিত্যাক্ত রয়েছে। অথচ মানসিক হাসপাতালের পিছনেই ঠাকুর অনুকুল চন্দ্রের আশ্রম, আতুর ঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। এদিকে ভবটিকে পুরাকির্তি বা ঐতিহাসিক হিসাবে দাবি করা হচ্ছে। পাবনা মানসিক হাসপাতালের অভ্যন্তরে অবস্থিত এই পুরাতন ভগ্ন প্রায় দুটি ভবন পরিত্যাক্ত। এই পরিত্যাক্ত ভগ্নপ্রায় ভবনটিতে নেশাখোরাও ভেঙ্গে পড়ার ভয়ে তার আশে পাশে যান না। এদিকে একটি সুত্র জানায়, টেন্ডার কার্যক্রম স্থগিত করার পরপরই ভগ্নপ্রায় ভবনটির দেয়ালে চুন দিয়ে রং করা হয়। যেন উচ্চ আদালতকে বোঝানো যায় এটি ব্যবহারযোগ্য।
পাবনা জেলা ও দায়রা জজের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এ্যাডভোকেট গোলাম সরওয়ার জুয়েল খান বলেন, সরকারী যায়গায় যত স্থাপনা থাকুক না কেন সেগুলো অপসারন করে, নতুন ভবন তৈরীতে কোন বাধা নেই। সরকার যখন অধিগ্রহন করে, তখন সেখানে যাবতীয় স্থাপনার ন্যায্য মুল্য পরিশোধ করে তা অধিগ্রহন করেন। সেখানে যদি কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থাকে সেটাও সরকার দেখ ভাল করে। এখানে আবেগের কোন স্থান নেই। বরং যারা টেন্ডার বাতিল করেছে, তারাই সরকারের উন্নয়ন কাজ বাধাগ্রস্থ করছে। কোন সরকারই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অবমুল্যায়ন করে না। তিনি এও বলেন, আমার জানামতে মানসিক হাসপাতালের সীমানার প্রাচীরের মধ্যে ঠাকুর অনুকুল চন্দ্রের মন্দীর বা স্থাপনা নেই।

সরোজমীনে গিয়ে দেখা যায় স্থাপনাটিতে কোন মন্দীর বা বিজ্ঞান ভবনের চিহৃ নেই। ভগ্নপ্রায় ভবনের চারদিকের দৃশ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায় সেখানে বসতবাড়ি এবং গোডাউন জাতিয় ভগ্ন্রপায় অবকাঠামো রয়েছে।
হেমায়েতপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মুন্তাজ আলী বলেন, গত বিএনপি সরকারের সময়ে ঠাকুর অনুকুল চন্দ্রের ভক্তদের দাবির মুখে, সরকার একটি কমিটি গঠন করে স্থাপনাটি পরিদর্শন করেন। কমিটি সেখানে পরিদর্শন করে আদৌ কোন মন্দির, আতুর ঘর বা বিজ্ঞান ভবন ছিল না মর্মে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
সাবেক ইউপি সদস্য জাহাঙ্গির আলম বলেন, ঠাকুরের ভক্তদের দাবি মিথ্যা ও বানোয়াট। সেখানে কোন মন্দির বা বিজ্ঞান ভবন কোন দিনও ছিল না। যখন পাকিস্থান সরকার অধিগ্রহন করে তখন সেখানে হিন্দু ও মুসলিমদের বাড়ি ঘর ও ফসলি জমি ছিল। অধিগ্রহনকৃত সীমানার মধ্যে ঠাকুর অনুকুল চন্দ্রের জমি ছিল। সরকার অধিগ্রহনকৃত যায়গার মালিকদের ন্যায্য মুল্য প্রদান করার পর সবাই মালিকানা ছেড়ে চলে যায়। অধিগ্রহনকৃত যায়গার একটি অংশে বর্তমান ভগ্নপ্রায় ভবন দুটি রয়েছে। যা অধিগ্রহনের পরপরই পরিত্যাক্ত হিসাবে ফেলে রাখে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে আটঘরিয়া উপজেলার জাসাস নেতা এফএম আবু জার শহরে ঠিকাদারি ও চাঁদাবজিসহ সকল কাজ করে থাকেন পরাগের নির্দেশে। ফয়সালের কোন যায়গায় কোন সমস্য হলেই খালেদ হোসেন পরাগ সেই যায়গা বা ব্যাক্তিকে মোবাইলে ফোন করে সমস্যা সমাধান করার চাপ দিয়ে থাকেন। এমন একটি ফোন কলের কথপোকথন আমাদের এই প্রতিনিধির হাতে এসেছে। সেখানে এমন হুমকি দেয়া হয়েছে সাংবাদিক মোবারক বিশ্বাস নিউজ প্রকাশ করলে তাকে আজিবন জেলে রাখা হবে। সেখানে ফয়সালকে টাকা প্রদানের জন্য চাপ দেওয়ার কথোপকথন রয়েছে।
টেন্ডার স্থগিত কি কারনে করা হয়েছে জানতে চাইলে, পাবনা জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, আমি নতুন, পাবনায় যোগদানের পর পরই ঘটনা। ধর্মীয় অনুভুতির কথা বলায় আমি গণপুর্ত নির্বাহী প্রকৌশলীকে নিলাম ও উন্নয়ন কার্যক্রমের টেন্ডার বন্ধ রাখতে বলেছিলাম। সরকারের অধিগ্রহনকৃত জমিতে উন্নয়ন কার্যক্রম বন্ধ রাখার সুযোগ রযেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদকের সামনে গনপুর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। নির্বাহী প্রকৌশলী জেলা প্রশাসককে জানান, ভগ্নাংশ ভবনটির পাশে পতিত জমিতে বিশ্বমানের আধুনিক ইনস্টিটিউট নির্মানের কাজ শুরু করা হবে। ভগ্নাংশ ভবনটি যেভাবে রয়েছে, সেভাবে রাখতে হবে জানিয়েছেন।
ভগ্নাংশ ভবনটির যায়গা কি বিশেষ রফার মাধ্যমে সৎসঙ্গ বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে? কারা দিচ্ছে, কারা জড়িত? এ ছাড়া পতিত জমিতে ভবন তৈরী করতে গেলে সেখানে নির্মান খরচ অনেক বেড়ে যাবে। সরকার বড় ধরনের অর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হবে। ঘটনা বিস্তারিত জানতে গণপুর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে গেলে নির্বাহী প্রকৌশলী রাসেদ কবিরকে পাওয়া যায়নি। তারমুঠো ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা: শাফকাত ওয়াহিদ বলেন, উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসাবে হাসপাতালে অভ্যন্তরে দুটি ভবনের ভগ্নাংশ অপসারন করে বিশ্বমানের আধুনিক ইনস্টিটিউট নির্মানের কথা ছিল। পরে আমাকে জানানো হয়েছে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। তবে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ কে বা কারা তা তিনি জানাতে পারেননি।

উল্লেখ্য মানসিক হাসপাতালের অভ্যন্তরে মাতৃমন্দির ও বিশ্ব বিজ্ঞান কেন্দ্র দাবি করা কৃষ্ণ দাস, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ফটোগ্রাফার সুমন দাস ও শুব্রত আদিত্যের বিরুদ্ধে গাইবান্ধার হরিদাস চন্দ্র তরুণী দাসের মত জোর পুর্বক জমি দখল করে মন্দির নির্মান ও যায়গা বিক্রি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে যা ইতিপুর্বে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।
কিসের ভিত্তিতে স্থাপনা ভাঙ্গা বন্ধ রাখা হয়েছে। মৌখিক কোন কথায় কোন টেন্ডার স্থগিত রাখার সুযোগ আছে কিনা? গণপুর্ত বিভাগ ওই যায়গা অপসারন না করে পাশ্ববর্তি যায়গায় কেন ভবন নির্মানের উদ্যোগ গ্রহন করেছেন ? ভিত্তিহীন দাবির মুখে গণপুর্ত বিভাগ এমন সিদ্ধান্ত কার নির্দেশে নিয়েছেন ? কর্তৃপক্ষ অবৈধ লেন-দেন অথবা উপরের কার নির্দেশে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষ বিষযটি খতিয়ে দেখবেন বলে পাবনার সচেতন মহল মনে করেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর ফটোগ্রাফার খালেদ হোসেন পরাগ লেন-দেন এর বিষয় বা টেন্ডার স্থগিতের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। এ বিষয়ে তার সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেন।